কোচিং করতে ঢাকায় এসে নিখোঁজ, কপিনে বন্দী হয়ে বাড়টফিরল রাকিবের মরদেহ
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে এসে অপহরণ ও হত্যার শিকার ১৭ বছরের তরুণ, পরিবারের কাছ থেকে দাবি ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ
ঢাকা থেকে নীলফামারীর ডিমলা—দূরত্ব কয়েক শ কিলোমিটার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় এসেছিল ১৭ বছরের রাকিবুল ইসলাম। ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে পূর্ব শেওড়াপাড়ার একটি মেসে থাকত সে। কিন্তু অনলাইনে পরিচয় হওয়া এক ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বের পরিণতি হলো ভয়াবহ। অভিযোগ, ওই ব্যক্তির ডাকে বেরিয়ে যাওয়ার পর অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও হত্যার শিকার হয় রাকিব। পরে তার মরদেহ কার্টনে ভরে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে রাকিবকে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে ডেকে নেন আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার। পরে তাঁকে শুক্রাবাদের একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে রাকিবকে জিম্মি করে পরিবারের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে মামুন দাবি করেছেন, একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় রাকিবের ঘাড় মটকে যায় এবং তখনই তার মৃত্যু হয়। এরপর মরদেহ গুম করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মরদেহ একটি কার্টনে ভরে স্কচটেপ দিয়ে মুড়িয়ে অটোরিকশায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান মামুন। পরে বিভিন্ন যানবাহনে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিজের এলাকায় যান তিনি। অভিযোগ, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে বাড়ির সামনে একটি সুপারি বাগানে গর্ত করে কার্টনসহ রাকিবের মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়।
মুক্তিপণের আশায় টাকা দেয় পরিবার
এদিকে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছিল রাকিবের পরিবার। ফোন ও অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে রাকিবকে জীবিত ফেরত দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে চারটি বিকাশ ও তিনটি নগদ নম্বরে মোট চার লাখ টাকা পাঠান। পরে মামুনের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা নগদ উদ্ধার করেছে পুলিশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাকিবের বড় ভাই জহুরুল ইসলাম জীবন প্রথমে কাফরুল থানায় নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় মামলা হয়। তদন্তে মুক্তিপণ দাবিতে ব্যবহৃত দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের সূত্র ধরে মামুনকে শনাক্ত করে পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পর মেলে মরদেহের সন্ধান
গত ৫ অক্টোবর শুক্রাবাদ এলাকা থেকে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া এলাকায় মাটি খুঁড়ে কার্টনের ভেতর থেকে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর বড় ভাই জীবন মরদেহটি শনাক্ত করেন।
ঘটনাটির তদন্তে হত্যার পর রাকিবকে জীবিত দেখানোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভিডিও তৈরির অভিযোগ এবং আরও দুজনের সম্পৃক্ততার বিষয়েও কিছু প্রতিবেদনে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল জানা না পর্যন্ত সেগুলোকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন থেমে গেল
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় এসেছিল রাকিব। তার লক্ষ্য ছিল পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ গড়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। অন্যদিকে, সন্তানকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবার মুক্তিপণের টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ফিরতে হয়েছে সন্তানের মরদেহ নিয়ে।
অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে গড়ে ওঠা সম্পর্ক কীভাবে ভয়াবহ অপরাধের দিকে গড়াতে পারে, রাকিব হত্যার অভিযোগ সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে মুক্তিপণের টাকা লেনদেন, মরদেহ গুমের চেষ্টা এবং এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা।
রাকিবকে কেন হত্যা করা হলো, মুক্তিপণের টাকা কোথায় গেছে এবং ঘটনায় আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা স্বজনদের।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট।